গুলশান-বনানী আবার জিগায়!

গুলশান-বনানী ব্রিজ

ইন্ডিয়া ট্যুরের জন্য স্পন্সর যোগাড় করতে গতকাল আমাদের দুই গ্রুপের দায়িত্বে ছিল গুলশান-বনানী এলাকা। স্পন্সর বাবদ বলতে গেলে এক পয়সাও আয় হয়নি তবে যাওয়া-আসার পথে যে হয়রানি হলাম তাতেই কমপক্ষে দুইটা ব্লগপোস্ট লিখে ফেলা যায়। দিনটা শুরুই হল দেরী দিয়ে, সাধারণত এলার্ম না দিলেও আমার ঘুম এমনিতেই ভেঙে যায়। কিন্তু এলার্ম দেয়া থাকা সত্তেও ঘুম ভাঙল ৮.৩৩ এ। যাহোক তাড়াহুড়া করে বাবু সেজে হাজির হলাম ডিপার্টমেন্টে। সেখান থেকে আভা আর শিহাবকে নিয়ে রওনা দেওয়ার কথা। আর নিমাতের সাথে দেখা হবে গুলশানে। জহির ভাইয়ের ক্যান্টিনে চাপার ব্যায়াম সহযোগে হালকা নাস্তা করে ঠিক করলাম প্রেস ক্লাব থেকে যাব। আভা আর শিহাব বনানী যাবে আর আমি নেমে যাব গুলশান-১ এ। খুব ভাল কথা, রিকশা নিয়ে তিনজনে গেলাম প্রেসক্লাবে। গিয়ে দাড়ালাম বিআরটিসি’র কাউন্টারের সামনে। প্রথমে এতটা খেয়াল করিনি, কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলাম বিআরটিসি’র যে বাসগুলো আসছে তার বেশিরভাগই হয় মিরপুরের নয়তো বালুঘাটের। আবদুল্লাহপুরের কোন বাস নেই। আরো কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলাম সামনে দিয়ে যত বাসা যাচ্ছে তার বেশিরভাগই মিরপুরের। ৩ নাম্বার বাস নামে যে একটা বাস এ রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করে তার কোন নাম নিশানাও নেই! চরম ধৈর্যের পরাকষ্ঠা দেখিয়ে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। নাহ্, কোন লাভ নেই। অবশেষে মিরপুরের বাসেই উঠে বসলাম। ভাবলাম ফার্মগেট গিয়ে সেখান থেকে নিশ্চয়ই গুলশানের বাস পাওয়া যাবে। কিসের কি! ফার্মগেটে গুলশানের কোন বাসই নেই। আচ্ছা তাও মানা গেল। একটা ৬ নাম্বার কিংবা গুলশান এক্সপ্রেসে উঠে গেলেই হবে। কিন্তু আরো যে সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল কে বলবে? ফার্মগেটে যে বিশাল একটা লাইন ছিল সেটা যে ৬ নাম্বারের মত লোকাল বাসের লাইন হতে পারে সেটা আমাদের কেউ চিন্তাও করে নি। ৬ নাম্বার বাস একটা আসল তার পিছনের দরজা বন্ধ। পয়লা ডিসেম্বর থেকে এটা নাকি গেটলক বাস হয়ে গেছে! মানুষ পাগলের মত বাসের দরজায় হামলে পড়ল। যারা ফার্মগেট নামবে তাদের জানালা দিয়ে নামতে হয় এমন অবস্থা। এ অবস্থায় ছেলে হয়েই উঠার সাহস করা মুশকিল আর একটা মেয়েকে নিয়ে উঠার কথা তো চিন্তাও করা যায়না। তো আমার বান্ধবী সাহসিকা জানাল সে এই বাসেই উঠতে পারবে। আমি বললাম অসম্ভব। এরপর বুদ্ধি বের হল চল রিকশা দিয়ে মহাখালী যাই সেখান থেকে আবার রিকশা করে গুলশান। তাই সই। রাস্তা পার হয়ে রিকশা করে মহাখালী রওনা দিলাম। শিহাবের মতে এটা ছিল এখন পর্যন্ত রিকশায় তার সবচেয়ে লম্বা জার্নি। উপরে বসায় বেচারা পায়ের অনুভূতিই হারিয়ে ফেলছিল। নাখালপাড়ার দিকের ভাঙা রাস্তায় তিনজন রিকশায় যাওয়া যে কত পেইনের ব্যাপার সেটা ভুক্তভোগী না হলে বোঝা মুশকিল। তিনজন ছেলে হলেও একটা কথা ছিল। একটা মেয়েকে তো আর রিকশার উপরে তুলে দেওয়া যায় না। সুতরাং সারা রাস্তা আভাকে গালাগালি করতে করতে গেলাম। দীর্ঘ সময় পর মহাখালী পৌছে রাস্তা পার হয়ে পাবলিক হেলথ ইন্সটিটিউটের গলিতে রিকশা ঠিক করার চেষ্টা করলাম, লাভ নাই। এরপরের গলি, লাভ নাই। ইতিমধ্যে গালিগালাজের টার্গেট আভা থেকে এখন ম্যানেজার রায়হান। আমি আর শিহাব পাল্লা দিয়ে রায়হানকে গালিগালাজ করতে করতে গেলাম। যে যাই বলুক গালিগালজ করার মাঝে একটা পাশবিক ধরনের আনন্দ আছে! এরপরের রাস্তা যে রাস্তা দিয়ে গুলশান-১ এ যায় সেখানে গিয়ে আরো ১৭ মাইল হেটে রিকশা পেলাম। গুলশান-১ ২০টাকা, তাই সই। আমি উঠে গেলাম। আভা আর শিহাব জাহান্নামে যাক। (অবশ্য ওরা জাহান্নামেই গেল। অর্ধেক রাস্তা হেটেও ওরা রিকশা পায়নি।) গুলশান-১ এ নিমাতকে নিয়ে গেলাম গুলশান-২ এর কনকর্ড টাওয়ারে। স্পন্সরদের গল্প আরেক পোস্টে হবে। এই পোস্টে শুধু জার্নির গল্প হোক। গুলশান-১ থেকে গুলশান-২ রিকশায় এতবার যাওয়া আসা করলাম যে রাস্তার সব বাড়িঘর মুখস্ত হয়ে গেল। সবচেয়ে মজা (মেজাজ গরম) হল যখন ১৩০ নাম্বার রোডের ২৪ নাম্বার বাড়ি খুঁজে বের করতে গেলাম। অনেক খুঁজে ২৫ নাম্বার বাড়ি বের করে চারজন বিশাল খুশি যে পরের বাড়িটাই ২৪ নাম্বার। গিয়ে আবিষ্কার করা হল যে সেখানে আসলে সেটা একটা পানির ওয়াসার পাম্প। চারজন বেশ কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। যদিও কিছুক্ষণ পরে নতুন উদ্যমে খুঁজে ২৪ নাম্বার বাড়ি বের করা হয়েছিল তারপরেও সেই হতভম্ব অনু্ভূতির কোন তুলনা নাই। এর মাঝে এসব কিছুর জন্য রায়হানকে দোষী সাব্যস্ত করে আমরা ঠিক করলাম রায়হানকে শায়েস্তা করার একটাই উপায়। সে উপায় না বলাই ভাল। তবে এটা বলতে পারি যে অনেক খুঁজেও সস্তা কোন রেস্টুরেন্ট না পেয়ে আমরা যে ফখরুদ্দিনের বিরিয়ানী দিয়ে লাঞ্চ করলাম তার মাঝে রায়হানের সাথে পার্সোনাল কোন ব্যাপার নাই। তার মাঝে আরো অনেক কিছু। তারপর ফেরার পালা। মাঝখানে শিহাব ছুটে গেল ডেটিং করতে। নিমাত চলে গেল বাসায়। আমি আর আভা বনানীতে আরেক জায়গা হয়ে বনানী বাস স্ট্যান্ডে গেলাম। আভাকে গেটলক (!) ৬ নাম্বারে তুলে দিয়ে আমি নেমে গেলাম মহাখালীতে। সেখান থেকে শাহবাগ গিয়ে হলে যাব। এরপর শাহবাগ যে ১.৩০ ঘন্টা দাঁড়িয়ে রইলাম তাতে আমার মনে হল ঢাকা শহরে শাহবাগ বা ফার্মগেট নামে কোন জায়গাই নাই। যা আছে শুধু মিরপুর আর কিছু যাত্রাবাড়ী। বিজয় সরণী থেকে হেটে জুতা পরে হেটে যাওয়া সম্ভব না সুতরাং সেটা বাদ। এরমাঝে দিনের প্রথম ৩ নাম্বার বাসের দেখা পেলা যার গেটে ৩ জন ঝুলছে। এত ভিড় যে মহাখালী দাড়ালই না। অনেক ধৈর্য নিয়ে দাড়িয়ে থাকার পর সিদ্বান্ত নিলাম ফ্লাইওভারের মাথায় গিয়ে ২৭ নাম্বারে যাব। রওনা দিয়ে কাঁচা বাজার পার হয়েছি তখন (খারাপ) কপালগুণে একটা উইনারের দেখা পেলাম! মহাখালী এত মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল তার ১% ও যদি উঠতে চায় তাহলে আমি উঠতেই পারব না। জ্যামে বাস আটকে যাওয়ায় উঠতে পারলাম। তারপরে মাত্র ৪৫ মিনিটে আজিমপুর হয়ে হলে পৌছে গেলাম। নিজের কপলা নিজেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হল। ৪.২১ এ রওনা দিয়ে মাত্র ৭টায় হলে পৌছে গেলাম। কি বিচিত্র এই দেশ!

পাদটীকা: এই দিনের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তিসমূহ।

১. আস্ত মুরগী

২. গ্লাসে পানি প্লেটে গুড়

৩. ৫ টাকা চাঁদা

৪. আরজ আলী মাতুব্বর আর

৫. গুলশান-বনানী ব্রিজ। (বিস্তারিত পরবর্তী পোস্টে)

খেরোখাতা : ২ : সেকেন্ড টাইম!!!

খেরোখাতা : ১ : পড়ুম না আমি কুয়েটে!!!

চলে গেলাম বাসায়। যেভাবেই হোক ঢাকার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে ভর্তি হতেই হবে। শর্ট হিট লিস্ট তৈরি করলাম। ঢাবি, এমাইএসটি, টেক্সটাইল। ফার্স্ট চয়েজ ঢাবির এপ্লাইড ফিজিক্স। এদিকে বাসায় ধুন্ধুমার অবস্থা। বাসায় রীতিমতো কোর্ট বসে গেল। কাহিনী কি? তুমি চইলা আসলা কেন? উত্তর দিতে দিতে জান খারাপ। তো নানা ভাবে বুঝিয়ে কুয়েটের চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে অবশেষে রাজি করালাম “সেকেন্ড টাইম” টেরাই করার জন্য। যারা দ্বিতীয় বার এডমিশনের জন্য টেরাই করে, তাদের ব্র্যান্ড নাম হচ্ছে “সেকেন্ড টাইম”। কুয়েটে পড়াকালীন সময়েই মা মারা যান। আর তাই আশেপাশের জ্ঞানী ব্যক্তিদের ভাষ্য ছিল, ছেলের মাথা পুরা গেছে!!! ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি ছাইড়া চইলা আসছে!!! এর কোনো ভবিষ্যৎ নাই!!! বিস্তারিত পড়ুন